তারিখ: ২০ জুলাই ২০২৫
স্থান: নৌ পরিবহন অধিদপ্তর, আগারগাঁও, ঢাকা
বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি একটি সম্ভাবনাময় খাত, যেখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মেরিনারদের অবদান অপরিসীম। দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে কাজ করার লক্ষ্যে প্রতিবছর শত শত মেরিন ক্যাডেট ও রেটিংস সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে চাকরি না পাওয়া এবং পেশাগত অগ্রগতিতে নানা বৈষম্যের কারণে তারা বর্তমানে মারাত্মক সংকটে রয়েছেন।
এই পটভূমিতে বাংলাদেশ মেরিনার্স কমিউনিটি ২০২৫ সালের ২০ জুলাই, রাজধানীর নৌ পরিবহন অধিদপ্তর, আগারগাঁও, ঢাকা-তে এক শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন আয়োজন করে। এতে তারা দুটি মূল দাবি উপস্থাপন করেন:
১. ডিপ্লোমাধারীদের সিডিসি (Certificate of Competency) প্রদানের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত অযৌক্তিক প্রস্তাব বাতিল করতে হবে।
২. প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেট ও রেটিংসদের জন্য চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সিডিসি (Certificate of Competency) কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
সিডিসি বা সার্টিফিকেট অব কম্পিটেন্সি হল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অনুমোদন, যা কোনও মেরিনারকে জাহাজে নির্দিষ্ট পদের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা প্রদান করে। এই সনদ ছাড়া আন্তর্জাতিক জাহাজে কাজ করা সম্ভব নয়। এটি STCW (Standards of Training, Certification and Watchkeeping) কনভেনশন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার (IMO) নির্ধারিত মান অনুসরণ করে প্রদান করা হয়।
তবে সম্প্রতি নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এমন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যেখানে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সিটিসি পেতে অতিরিক্ত শর্ত আরোপের চিন্তাভাবনা করা হয়েছে, যা দেশের প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং মেরিন পেশাজীবীদের সঙ্গে স্পষ্ট বৈষম্যমূলক আচরণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নৌ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮০০-১০০০ জন ক্যাডেট ও রেটিংস পাশ করছেন। তারা অধিকাংশই সরকারি বা সরকার অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে IMO অনুমোদিত কোর্স সম্পন্ন করে থাকেন। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ বছর বছর অপেক্ষা করেও কোনো জাহাজে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন না।
এছাড়াও, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মেরিনারদের চাহিদা থাকলেও জব প্লেসমেন্ট সিস্টেমের অভাব, বেসরকারি শিপিং কোম্পানিগুলোর অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, এবং সরকারি দিকনির্দেশনার অভাব—এই সমস্ত কারণে দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেরিনাররা বাস্তবজগতে স্থায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না।
২০ জুলাই সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শতাধিক মেরিন ক্যাডেট, মেরিনার , রেটিংস এবং তাদের অভিভাবকরা অংশগ্রহণ করেন।
তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারে লেখা ছিল:
“অযৌক্তিক সিডিসি শর্ত বাতিল করো”
"Stop Unnecessary Cadets Recruitment NOW"
“মেরিন ক্যাডেটদের চাকরি চাই”
“প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, চাকরি নিশ্চিত করো”
কোনো রকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই ঘণ্টাব্যাপী এই কর্মসূচি সম্পন্ন হয়। মানববন্ধন শেষে কমিউনিটির পক্ষ থেকে একটি লিখিত স্মারকলিপি নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে জমা দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন স্তরের মেরিনার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তারা বলেন—
> “ডিপ্লোমা মেরিনারদের জন্য আলাদা শর্ত বসানো মানেই পেশাগতভাবে বৈষম্য সৃষ্টি করা। এটি শুধু অন্যায় নয়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও হুমকি।”
বর্তমানে বিশ্ববাজারে দক্ষ নাবিক ও মেরিনারদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফিলিপাইন, ভারত, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মেরিনার বিশ্বের বিভিন্ন শিপিং লাইনে কাজ করছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। বাংলাদেশও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই, তবে তার জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী নীতিমালা, জব প্লেসমেন্ট সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসারে স্বচ্ছ প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ ব্যবস্থা।
যদি এই মুহূর্তে ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ক্যাডেট-রেটিংসদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে একটি সম্ভাবনাময় খাত ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ মেরিনার্স কমিউনিটির এই মানববন্ধন কেবল একটি দাবিদাওয়া নয়, এটি একটি সতর্ক সংকেত—যা দেশের মেরিন খাতকে গঠনমূলক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান।
সরকার, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি অনুরোধ থাকবে, যেন তারা মানবিক, বাস্তবভিত্তিক ও পেশাগত সম্মান বজায় রেখে এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করেন। তাহলেই বাংলাদেশ তার সামুদ্রিক সম্ভাবনার প্রকৃত দ্বার উন্মোচন করতে পারবে।



সময় ভেলা রিপোর্ট